-->

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কী এবং কীভাবে কাজ করে

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

ভিআর - ভার্চুয়াল রিয়ালিটি হচ্ছে কম্পিউটার দিয়ে তৈরি করা এমন এক জগৎ, যা বাস্তবের মত মনে হয়। ভিআর হেডসেট পরলে আমরা এক ধরনের সিমুলেশন বা কৃত্রিম জগতে চলে যাই, যা আমাদের চারিপাশের পরিবেশের তুলনায় একদমই আলাদা।

ভিআর এর মাধ্যমে ইউজাররা কৃত্রিমভাবে কোনো কিছু দেখা, শোনা, স্পর্শ করা থেকে শুরু করে অনেকসময় স্বাদ গ্রহণের অনুভূতিও পেয়ে থাকেন।

ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই যেভাবে কাজ করে

ভিআর ব্যবহার করার অভিজ্ঞতা থাকলেও কীভাবে এই প্রযুক্তি কাজ করে, তা অনেকেই জানেন না। এই লেখায় আমরা ভিআর প্রযুক্তি নিয়ে প্রাথমিক কিছু বিষয় জানার চেষ্টা করবো। একই সঙ্গে ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে কীভাবে বাস্তব জগতের অভিজ্ঞতা লাভ করা হয়, সেটাও বোঝার চেষ্টা করবো।

ভিআর সম্পর্কে প্রাথমিক ভাবে যা কিছু জানার আছে

ভার্চুয়াল রিয়ালিটির প্রাথমিক কাজ হলো দৃশ্য তৈরি করা। প্রতিটা ভিআর হেডসেট তৈরির উদ্দেশ্যই হলো, যতটা সম্ভব বাস্তবের মতো দৃশ্য তৈরি করা। এজন্য হেডসেটে একটা বা কখনো কখনো দুই চোখের জন্যে দুইটা আলাদা স্ক্রিন থাকে।

ভিআর হেডসেট পরে থাকলে বাইরের কোনো কিছু দেখা যায় না। স্ক্রিন আর চোখের মাঝখানে থাকে দুইটা অটোফোকাস লেন্স। এই লেন্সের কাজ হচ্ছে চোখের নড়াচড়া ও পজিশন অনুযায়ী স্ক্রিনের সাথে ফোকাস করা। ভিআর হেডসেট সাধারণত মোবাইল ফোন দিয়ে কানেক্ট করা যায়। এছাড়া চাইলে এইচডিএমআই ক্যাবল দিয়ে পিসির সাথেও কানেক্ট করা যায়।

ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে ছবি বাস্তবের মতো দেখা যাবে কি না, তা নির্ভর করে কয়েকটা বিষয়ের ওপর। ফ্রেমরেট, রিফ্রেশ রেট এবং ফিল্ড অফ ভিউ হলো তেমনই কিছু বিষয়। জিপিইউ (গ্রাফিক্যাল প্রসেসিং ইউনিট) প্রতি সেকেন্ডে কী পরিমাণ ইমেজ বা ছবি প্রসেস করতে পারে তার পরিমাপকেই বলা হয় ফ্রেমরেট। আবার ভিআর-এ ছবি কতটুকু ঝকঝকে দেখাবে, সেটা নির্ভর করে রিফ্রেশ রেটের ওপর। আর দর্শকের চোখ এবং মাথার নড়চড়ার সাথে ডিসপ্লে কতটুকু জায়গা জুড়ে দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা দিতে পারবে, সেটার পরিমাপকে বলা হয় ফিল্ড অফ ভিউ বা এফওভি।

ফ্রেমরেট এবং রিফ্রেশ রেট যদি ন্যূনতম ৬০ fps (ফ্রেম পার সেকেন্ড) হয় আর ফিল্ড অফ ভিউ যদি ন্যূনতম ১০০ ডিগ্রি থাকে, তাহলে ভিআর বাস্তবের মতোই দেখা যায়। তবে ফিল্ড অফ ভিউ ১৮০ ডিগ্রি কোণে সেট করা সম্ভব হলেই ব্যবহারকারী সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা লাভ করেন। সাধারণত রিফ্রেশ রেটের চাইতে ফ্রেমরেট বেশি হলে দৃশ্যের কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে যায়। এজন্যে ফ্রেমরেটকে মনিটরের রিফ্রেশ রেটের মধ্যে রাখা হয়। ফ্রেমরেট আর রিফ্রেশ রেটের মধ্যে সমন্বয় আনার পদ্ধতিকে বলা হয় ভার্টিকাল সিংক বা ভিসিংক।

যেসব প্রতিষ্ঠান ভিআর ডিভাইস তৈরি করে, তারা ফ্রেমরেট আর রিফ্রেশ রেটের মধ্যে মিল রাখার ব্যাপারটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। কারণ, এই দুইটা বিষয়ের মধ্যে মিল না থাকলে কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য স্বচ্ছন্দে দেখা যায় না। এই ধরনের অসংলগ্নতাকে সাইবার সিকনেসও বলা হয়।

আবার যখন কোনো কাজ বা অ্যাকশন ঘটে আর যখন সেটা স্ক্রিনে দেখা যায়, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী সময়টাকে ল্যাটেন্সি বা অসামঞ্জস্য বলা হয়। মানুষের চোখ কমপক্ষে ২০ মিলি সেকেন্ডের মধ্যে দুইটা ফ্রেম দেখলেই মস্তিষ্কের মধ্যে থাকা গ্যাপ বা অসামঞ্জস্য বুঝতে পারে না। অর্থাৎ ফ্রেমরেট, রিফ্রেশ রেট আর ফিল্ড অফ ভিউয়ের মধ্যে কোনো একটা যদি ঠিকঠাক কাজ না করে, তাহলে দেখার সময় ল্যাটেন্সি তৈরি হয়।

ভিআর প্রযুক্তিতে আরও যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ

ব্যবহারকারীদের বাস্তব আর প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা দিতে ইমেজিং-এর পাশাপাশি ভিআর সিস্টেমে আরো বেশ কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। যেমন:

সাউন্ডের ব্যবহার

দৃশ্যের সাথে শব্দ জুড়ে দেয়া হলে ইউজাররা আরো বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। তাই ভিআর প্রযুক্তিতে হেডফোনের মাধ্যমে থ্রিডি সাউন্ড এফেক্ট ব্যবহার করা হয়। তবে ভিআরের মাধ্যমে ইউজার যা দেখতে চান, সেটার সঙ্গে সাউন্ডের সামঞ্জস্য থাকাটাও জরুরি। যেমন, রূপকথা নিয়ে বানানো কোনো ভিডিওতে হরর মিউজিক ব্যবহার করা হলে দর্শকের কাছে তা ভালো না লাগারই কথা।

চোখ আর মাথার নড়াচড়া ট্র্যাকিং করা

চোখ আর মাথার নড়াচড়া ট্র্যাক করার জন্য লেজার পয়েন্টার, এলইডি লাইট বা মোবাইল সেন্সর ব্যবহার করা হয়। মোবাইলের মাধ্যমে ভিআর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ত্রিমাত্রিক মুভমেন্ট নির্ণয় করার জন্যে এক্সেলেরোমিটার ব্যবহার করা হয়। আবার কৌণিক মুভমেন্ট নির্ণয় করার জন্য ব্যবহার করা হয় জাইরোস্কোপ। এছাড়াও ভূমির সাথে পজিশনিং বোঝার জন্যে ব্যবহার করা হয় ম্যাগনেটোমিটার।

ভিআর-এর মাধ্যমে আরও নিখুঁত অভিজ্ঞতা পাওয়ার জন্য যে ঘরে ভিআর হেডসেট ব্যবহার করা হবে, সেই ঘরে ক্যামেরা আর সেন্সর স্থায়ীভাবে ইন্সটল করতে হয়। তবে এই ধরনের সেটআপ তৈরি করতে খরচও অনেক বেশি পড়ে যায়।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ভিআর শিল্পের বাজার অনেক দ্রুতগতিতে বাড়ছে। চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী ভিআর ডিভাইসের মোট বাজারমূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের মধ্যেই এর বাজারমূল্য বেড়ে ১২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। গ্রাহক এবং নির্মাতা থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ভিত্তিক গেমিং শিল্পও ভিআর শিল্পের এই উন্নতির মাধ্যমে লাভবান হবেন।